শিরোনাম
প্রচ্ছদ / অন্যান্য / পার্বত্যাঞ্চলে চাকমাদের শ্রেষ্ঠ উৎসব বিজু

পার্বত্যাঞ্চলে চাকমাদের শ্রেষ্ঠ উৎসব বিজু

পার্বত্যাঞ্চলে চাকমাদের শ্রেষ্ঠ উৎসব বিজু
-ঃ মং ইয়ং মারমাঃ-
আমাদের এই প্রাচীন বঙ্গভূমি বা বাংলা অঞ্চল এক সময় ইতিহাসে বর্ণিত গ্রীক যোদ্ধা মহাবীর আলেক জেন্ডার এই অঞ্চলে পা রাখার পর, চার পাশের বিচিত্র পরিবেশ ও দৃশ্য দেখে দেখে এই অঞ্চলটি তার নিকট অতি বিস্ময় ঠেকেছিল/এই প্রতিক্রিয়া তার অন্তরে এবং ভাবনার অনেক দিন ক্রিয়া করেছিল বলে জানা যায়। সেটি বহু বছর আগের কথা।
আর তখন পরিবর্তিত আধুনিক সময়ের চাকা আমাদের জীবনের গতিকে অনেক কিছু বদলে দিয়েছে/এখন সেই প্রাচীন যুগ নেই আর আমরা আধুনিক বঙ্গ বা বাংলা অঞ্চলের আল্ট্রা মর্ডান মানুষ।
আমাদের জীবন যাপন চলা ফেরা, কথাবার্তা পোশাক আশাক এবং স্বভাবে সবাইর মধ্যে যেন আধুনিকতার ছাপ ছড়িয়ে থাকে। অর্থাৎ এই সকল বিষয় জাহির করার প্রবণতা সকল ব্যক্তির মধ্যে সব সময় দেখা যায।
আমাদের এই বিচিত্রময়ও আকর্ষনীয় বঙ্গঁ বা বাঙলা ভাষাভাষি অঞ্চলে মূলত নানান ভাষাভাষি জ্ঞাতি গোষ্ঠীর স্থায়ী বসবাস।
তাদের মধ্যে ফর্সা, কেউ কালো, কেউবা তামাটে আবার কারো হলদে গায়ের রং চোখে পড়ে/কারো কারো চেহারা গোলাকৃতি ও চেষ্টা, কেউ বা টিকালো নাকের সুন্দর চেহারার অধিকারী।
এমন নয়ন সুন্দর দৃশ্য এই বাংলা অঞ্চলে চোখে পড়ে বেশ। উল্লেখ্য এসব মানুষের গাত্র বর্ণ মুখের ভাষা, শব্দ উচ্চারণে বৈসাদৃশ্য দৃষ্টি গোচর হলেও কালচার বা সংস্কৃতি দিক থেকে একে অপরের মধ্যে বহুলাংশে মিল দেখতে পাওয়া যায়।
বস্তুতঃ এটি এক বৈচিত্র্যময় মহা জাতীয়তার পরিমন্ডল সৃষ্টি করেছে বাংলায়। বিশ্বের অনেক জাতি গোষ্ঠী মানুষকে তা সহজে মুগ্ধ করেছে। স্বাধীন বাংলা দেশটি এখন মূলতঃ বহুজাতিক ও সাংস্কৃতিক এক জনপদের বঙ্গঁভূমি। এক কথায়, সমাজ পরিবার সর্বোপরি পরিবেশ বৈচিত্র্যে ভরা।
বর্তমান সময়ে সবার মধ্যে যে জিনিষটি বেশী অনুভূত হয় তা হচ্ছে, বহু জনজাতির মধ্যে এক মহা মিলনের ঐক্যের সুর ধ্বনি। ফলে, এক সম্প্রদায় আরেক সম্প্রদায়, এক জাতি আরেক জাতির মধ্যে শনৈঃ শনৈঃ বেড়ে উঠছে মিথিস্ক্রিয়া ও আত্মিক সংযোগ।
এক কথায় বৃদ্ধি পাচ্ছে বৈবাহিক ও জাতি গোষ্ঠীর সম্পর্ক।
অন্যদিকে, দুরে সরে যাচ্ছে সন্দেহ অবিশ্বাস ও বিভেদের দেয়াল। মানুষের মধ্যে অনৈক্য ভেঙ্গে পড়ছে।
এশিয়া, আমেরিকা ও ইউরোপের একাধিক দেশ সহ গোটা বিশ্বময় এটাই পরিদৃশ্যমান হয়ে উঠছে। কেউ কেউ ধারনা করছে দূর ভবিষ্যতে এক সময় গোটা পৃথিবীতে মানুষ বৈচিত্র্যের মধ্যে মানবিক বোধে উজ্জীবিত হয়ে এক দেহ এক প্রাণ চেতনায় জীবন ধারন করবে।
কয়েক শতাব্দীর পূর্বের কথা। কোন এক সময় বিচিত্রময় বঙ্গ বা বাঙলা দেশে কোন এক সময় যোদ্ধা গ্রীক মহাবীর আলেকজেন্ডার পৃথিবী জয়ের নেশায় পরিভ্রমন করতে করতে এই প্রাচীন জনপদ বাংলা অঞ্চলে এসে পা পড়ে। তখন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়নি। এই বঙ্গঁভূমি অবলোকনে তাকে অত্যন্ত বিস্মিত ও মুগ্ধ করে।
আর অত্র অঞ্চলের মানুষের ভাষা সংলাপ বর্ণ চেহারা স্বভাব ও উৎসব বিচিত্রতা চোখে দেখে মন্তব্য করেছিলেন, সত্যিই সেলুকাস ! কি বিচিত্র এই দেশ।
এই মহাবীরের উক্তি আজও বিখ্যাত হয়ে আছে আজকের বাংলা ভাষী বাংলা অঞ্চলের মানুষের কাছে।
বাংলা অঞ্চলের মানুষের জীবন অত্যন্ত কৌতুক আর আনন্দে ভরা।
আমাদের এ বিচিত্র ও আধুনিক বঙ্গঁ বা বাংলা ভাষা ভাষি মুল্লুকে আবহমান কাল থেকে ক্রমাগত ভাবে চলে আসছে নানা প্রকারের আনন্দময় ও বর্ণাঢ্য মেলা বা উৎসব। এগুলো হলো পূজা পার্বন উৎসব ও খেলাধূলা যেমন- পৌষ মেলা, বসন্ত মেলা, চড়ক গাছা মেলা বৈশাখি মেলা, হালখাতা অনুষ্ঠান দূর্গাপূজা উৎসব দোল যাত্রা বৈশাখি পূর্ণিমা অন্যান্য পূর্ণিমা সহ আদিবাসীদের বৈ-সা-বি ইত্যাদি অনুষ্ঠান।
বাংলার মানুষের আমুদে জীবনে আনন্দোৎসবের কোন কমতি নেই। মনে হয় পুরো জীবনটাই যেন উৎসবের আনন্দে ভরে উঠেছে।
বাংলার মানুষ সারা বছর আনন্দে মেতে থাকুক এই শুভ কামনা অনেকেই করে।
বাংলাদেশে  বন্তুতঃ ষড় ঋতুর দেশ। প্রতিটি  ঋতুই মূলতঃ উৎসবে ভরপুর। বছর ঘুরে মানুষের জীবনে বার বার ফিরে আসে উৎসব সমূহ আনন্দের বার্তা নিয়ে। আর উৎসব সমূহকে ঘিরে হাসি আনন্দ কান্না ও সুখ দুঃখ নিয়ে উৎসব প্রিয় মানুষের এক সুরে জীবন গাথা।
বাংলাদেশে সমতল ও পার্বত্যাঞ্চলে অসংখ্য বিভিন্ন পাহাড়ি আদিবাসী ও ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর বসবাস। তাদের মধ্যেও যেমন-পূজা পার্বন ও উৎসব রয়েছে তেমনি এর বিচিত্রতা ও লক্ষ্য করার মত।
এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম প্রধান জনগোষ্ঠী চাকমা/বর্মী ভাষা ছাং ম্যাং থেকে (হাতির রাজা) চাকমা শব্দের উদ্ভব/ (চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত বিরাজ মোহন দেওয়ান লিখিত গ্রন্থ)। এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান জনগোষ্ঠী চাকমা, এগার ভাষা ভাষি জনগোষ্ঠীর মধ্যে তারা শীর্ষস্থানে। ইদানীং শিক্ষা গ্রহন সরকারি চাকুরি আধুনিকতা ও আর্থ সামাজিকতায় তারা বহুদুরে এগিয়ে গেছে।
দেশের জনসংখ্যার জাতীয় শিক্ষার হারকে টপকে গেছে। দেশ বিদেশে শিক্ষা গ্রহন ও সরকারের উচ্চ পদে চাকুরিতে তাদের প্রচুর দেখা যায়।
এই চাকমা জনগোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠ উৎসব হচ্ছে বিজু। এক কথায় প্রধান আনন্দোৎসব। তারা এই উৎসবের দিনে প্রচুর আনন্দে নিজেদের গা ভাসিয়ে দেয়। মাতোয়ারা হয়ে যায়।
বাংলা বর্ষের শেষ দিনে ও নববর্ষের প্রথম দিনে চাকমা জনগোষ্ঠীরা বিজু উৎসব পালন করে থাকে। পুরাতন বর্ষের শেষ দিনে মুল বিজু এবং নববর্ষের প্রথম দিনের নাম গোজ্যা পোজ্যা দিন।
আর ক’দিন পরেই ফুল বিজু, মুল বিজু ও গোজ্যা পোজ্যা দিন এই তিন বিজুর (তিন দনি) কার্যক্রম কে লক্ষ্য রেখে তারা জাঁক-জমক আর বর্ণাঢ্য সহকারে অনুষ্ঠান পালন করবে।
১। ফুল বিজু
২। মূল বিজু
৩। গোজ্যা পোজ্যা বিজু
ফুল বিজু
ফুল বিজুর দিনে সবাই খুব ভোরে উঠে নানা রঙের ফুল তুলতে যায় নানা জায়গায়। নতুন বছরের প্রথম দিনে মাছ মাংস নিয়ে ভাত খেলে সারা বছর ঐভাবে ভাল ভাল খাদ্য খাওয়া যাবে বলে অনেক চাকমারা বিশ্বাস মনের মধ্যে লালন করে।
একারনে ফুল বিজুর দিনে গ্রামের অনেকে দলবদ্ধ হয়ে হইচই করতে করতে বন জঙ্গলে হরিণ শুকর ও পাখি ইতাদি শিকার করে। ঘরের মধ্যে অতিরিক্ত মাংস আগুনের তাপে শুকিয়ে রেখে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে রাখে। এই দিনে চাকমারা সংগৃহীত নানা রঙের ফুল দিয়ে ঘর সাজিয়ে রাখে। ঘরের সুন্দর পরিবেশ ও পবিত্রতা বজায় রাখে।
মূল বিজু
ফুল বিজুর পরে মূল বিজু। চাকমাদের শ্রেষ্ঠ উৎসবের দিন। তাই ঘরে ঘরে বিভিন্ন প্রকার খানা পিনার ব্যবস্থা করা হয় এবং অতিথিদের জন্য সবার গৃহদ্বার উন্মুক্ত থাকে।
শিশু কিশোররা এই দিনটির জন্য পূর্ব থেকে সকল প্রস্তুতি গ্রহন করে। তারা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্থানীয় মুরব্বীদের  খাবার দিয়ে আসে। বয়োজ্যোষ্ঠদের প্রনাম জানায় এবং তাদের কাছ থেকে আর্শীবাদ গ্রহন করে। গৃহিনীরা ঘরে যতœ করে বানানো তাদের নানা ধরনের খাবার ও পিঠা পরিবেশন করে। নানা ধরনের খাবারের মধ্যে প্রধান এবং উল্লেখ যোগ্য হলো, পায়েস, চনা বিরানী, পাচন, অন্যদিকে বড় পিঠা মারে পিঠা ও বিন্নি পিঠা। কেউ কেই মনে করে সাতটি ঘরে পাচন খেলে পেট খারাপ হয় না। বিজুর দিনে ভোর থেকে কিশোরী তরুনীরা দল বেধে নদী থেকে পানি তুলে গ্রামের বুড়ো বুড়িদের ¯œান করায় এবং চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী পালা গান হচ্ছে রাধামন ধনপুদি/এক সময় বিজুর অনুষ্ঠানে পালাগান গাওয়া হয়। এখন অবশ্য কম পরিলক্ষিত হয়।
গোজ্যা পোজ্যা দিন
অর্থাৎ এটি গড়াগড়ি খাওয়ার দিন। চাকমারা এই দিনে হাঁসি খুশী থাকার চেষ্টা করে থাকে। কারণ তাদের বিশ্বাস এই দিনে তারা যা করবে তা তারা সারা বছর করবে। সবাই আনন্দে মেতে থাকে এই দিনে। এই দিনটিকে বুড়োরা জগড়া কাঞ্জি নেশা জাতীয় জিনিষ খেয়ে খুব আনন্দ স্ফূর্তি করেন। তারা নাতি নাতনিদের বাড়িতে ঘুরে বেড়ায় এবং তাদের আর্শীবাদ প্রদান করেন।
চাকমারা সমাজে সচরাচর প্রত্যেকে এই দিনে নিজেদের আত্মীয়দের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে ভাত খাওয়ায়। অনেকে বাড়িতে বৌদ্ধ ভিক্ষুর এনে মঙ্গল সূত্র গ্রহন করে। সন্ধ্যায় মন্দিরে গিয়ে প্রদীপ জ্বালায় এবং নতুন বছরের জন্য প্রার্থনা করে সুখ ও শান্তিময় জীবন কাটাবার।

পড়ে দেখুন

“চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ রক্ষা” পরিষদের নিয়মিত মাসিক সভা অনুষ্ঠিত

“চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ রক্ষা” পরিষদের নিয়মিত মাসিক সভায় সম্মানিত সভাপতি আলহাজ¦ আবুল কালাম আজাদ এর …