শিরোনাম
প্রচ্ছদ / তৃণমূল / বান্দরবনে |আলিকদমের মুরং কমপ্লেক্স

বান্দরবনে |আলিকদমের মুরং কমপ্লেক্স

বান্দরবনে |আলিকদমের মুরং কমপ্লেক্স

আফরিন জামান লিনা:অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম। এই অঞ্চলে না গেলে বোঝাই যায় না কত অপরুপ সৌন্দর্যে সেজে আছে আমাদের জন্মভুমি।কবির ভাষায় সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি, এত টুকুন মিথ্যা কবি বলেন নাই। এই মাসের মাঝামাঝি আমি ছিলাম এই রুপ সম্রাজ্ঞের বিপুল ভান্ডারের রাজ্যে। হ্যা পার্বত্য চট্টগ্রামে। চিটাগং হিল ট্র্যাক্ট সংক্ষেপে সি এইচ টি। এটা নিয়ে দ্বিতীয়বার আমার এই অঞ্চলে ভ্রমন করা। নিজের লেখালেখির উৎসাহ আর এই বাংলার রুপকে অতি নিকট থেকে দেখার লোভ আবারো নিয়ে গিয়েছিল আমাকে সি এইচ টি তে। বলতে পারেন নিজের গবেষনার খনি খোজার লোভেও চলে যাওয়া সমতল থেকে শত শত মাইল উঁচুতে।

গত ডিসেম্বরে সিএইচটি থেকে ফিরে এসে আমি লিখেছিলাম বান্দরবনে মুরং জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত পরিমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। তখনো আমি জানিনা বান্দরবন জেলার অন্তর্গত আলিকদম উপজেলাতে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর করা মুরং কমপ্লেক্স। বান্দরবান ব্রিগেড এবং আলিকদম জোনের সার্বিক তত্ত্বাবধায়নে এখানে আবাসিক ভাবে রয়েছে ১১৭ জন শিক্ষার্থি। যার ভেতরে ৫০ জন মেয়ে এবং ৬৭ জন ছেলে। আমরা কথায় কথায় আমার দেশের এই অতন্দ্র প্রহরীদের ধিক্কার সহকারে কথা বলি। পার্বত্য চট্টগ্রাম বলতেই আগেই এক ঘা দিয়ে গাল দিয়ে উঠে আমাদের সুশীল সমাজ। তাদের মতে ওখানে সেনাবাহিনী ঘাস কাটে। যদিও পাহাড়ি ঘাস কেটে সুপ্রশস্ত রাস্তা বা মনোহর স্থাপনা সবই এই গাল খাওয়া পার্টিদেরই করা। যা শুধু এই অঞ্চলে গিয়ে একটু সুনজরে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায়। মুরং কমপ্লেক্সের কথা জানার পর এবার আমি ছুটে যাই আলিকদমে।বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বান্দরবান জেলার অন্তর্গত আলিকদম একটি উপজেলা। এই উপজেলার দক্ষিনে রয়েছে মায়ানমার। উত্তরে লামা, পূর্বে থানচি,এবং পশ্চিমে নাইক্ষ্যাংছড়ি উপজেলা।

পারতপক্ষে “আলোহক্যডং” থেকে আলীকদম নামের উৎপত্তি। বোমাং সার্কেল চীফের নথি পত্র ও১৯৬৩ সালের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার কর্তৃক আকা মানচিত্রে আলোহক্যডং নামের সত্যতাপাওয়া যায়। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক আতিকুর রহমান এর মতে আলী পাহাড়ের সাথে সঙ্গতি শীলনাম হল আলীকদম। তাছাড়া কথিত আছে যে ৩৬০ আওলিয়া এ উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের জন্যএসেছিলেন। তাদের মধ্যে আলী নামে কোন এক সাধক এতদঞ্চলে আসেন। উনার পদধুলিতে ধন্য হয়ে এএলাকার নাম করণ হয় আলীকদম। পূর্ববর্তী সময়ে এটি লামার একটি ইউনিয়ন ছিল। ১৯৮২সালেবাংলাদেশ সরকার প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের ফলে একে উপজেলায় অধিষ্ঠিত হয়।৬৩৬ টি গ্রাম বাপাড়ার সমন্বয়ে আলীকদম উপজেলায় আলীকদম সদরচৈক্ষ্যং ইউনিয়নের আওতায় ৪ টি ইউনিয়নপরিষদ ।আলীকদম সদর,চৈক্ষ্যং,নয়াপাড়া,কুরুকপাতা। আর এই আলিকদম সদরেই রয়েছে মুরং কমপ্লেক্স। ২০০৮ সালের ১৫ই জুলাই ৩৫ জন শিক্ষার্থি নিয়ে আলিকদম জোনের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদের হাত ধরে মুরং কপ্লেক্সের জন্ম।যেখানে এখন রয়েছে ১১৭ জন ছাত্রছাত্রী। এখান থেকে এস এস সি পাস করে মুরং ছেলেমেয়েরা চলে যাচ্ছে সমাজের নানা স্তরে। কেউ উচ্চতর পড়াশোনা কেউ চাকুরী কেউ ব্যাবসা। পার্বত্য অঞ্চলের মুরংদের শিক্ষার নিম্ন অবস্থানের জায়গা থেকে তুলে আনার এই প্রচেষ্টাকে স্বাগত না জানানোর কোন কারন থাকতে পারে বলে মনে করা উচিৎ নয়। অথছ স্বাগত দূরে থাক এই অঞ্চলের একটা বড় অংশ এই কার্যক্রম সম্পর্কে জানেই না। জানবেই বা কি করে এখানে যে প্রচার করার কেউই নেই। যেসব সুশীল সমাজ এই অঞ্চল নিয়ে কাজ করছেন তারা এই সকল অবাঞ্ছিত মানুষদের জন্য না কথা বলে কথা বলছেন যাদের হয়ে  বা যে বিষয়গুলি নিয়ে তা এই পাহাড়ের সরল মানুষগুলির কতখানি প্রয়োজনে আসছে এটাও একটু খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

যারা খুব দর্পের সাথে বলছেন সেনাবাহিনীর এখানে কি কাজ? তাদের বলি আপনারা দয়া করা সেনাবাহিনীর এই মাছি মারার দায়িত্বটা নিন। যে ছেলেটা ২০/২১ বছরের তরুন ল্যাফটেন্যান্ট সে তার পরিবার,সমাজ,চাকচিক্যময় কর্মস্থল ছেড়ে এখানে এসে আসলে বসে কি করছে!!!!!!! এই অভিজ্ঞতাটা আপনাদেরো থাকা উচিৎ। যেই অঞ্চলে বিদ্যুৎ নেই,প্রযুক্তির ছোয়া নেই সেই ধরনের একটা পাহাড়ের উপরে একটা ক্যাম্প করে ওরা আসলে কেন থাকছে?? ঐ ক্যাম্পের পাস দিয়ে যেই সুপ্রশস্ত রাস্তা চলে গেছে আপনাদের পৌঁছানোর জন্য সেই রাস্তা করার দায় কি ওর???? যেই অঞ্চলে বিদ্যুৎ নেই সেখানে বিদ্যুতের খাম্বা  বসানোর দায়িত্ব কি ওর??? যে এলাকায় মেডিকেল সেবা নেই সেই এলাকায় ঔষধ পৌছে দেবার দায়িত্ব কি শুধুই ওর??? আপনারা কেন রাজধানীর বুকে এসির হাওয়াতে বসে ওদের গাইল দিচ্ছেন??? আপনারাই তো এই পাহাড়ের সরল মানুষগুলির ভালবাসার গঙ্গা। আসুন না ওদের কাছে। থাকুন ওদের সাথে মিশে। আপনাদের কন্ঠগুলি কেন ওদের শিক্ষা নিয়ে হয়না??? কেন ওদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে হয়না??? যখন একটা পাহাড়ি মেয়ে তার পৈত্রিক সম্পত্তিকে বেদখল হয়ে যাবার জন্য কেঁদে ফিরে কেন আপনাদের কন্ঠ তাদের জন্য কথা বলেনা??? কেন মুকুল চাকমা অপহৃত হবার পরে তার মেয়ে নমিশা চাকমা বা মনিশা চাকমার জন্য আপনারা কথা বলেন না? মুকুল চাকমা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সদস্য ছিল তাই????? কোথায় নমিশা??? কেন মানবাধিকার এখানে নিশ্চুপ??? কথা বলতে জানেন, প্রতিবাদ করতেও জানেন,আপনারাই এইগুলির অধিপতি, তাহলে আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি এত পক্ষপাতিত্য কেন???? সেনাবাহিনীর কোন সদস্য ঐ অঞ্চল কিনে নিয়ে বসে নেই। ওরা মাসে সেই বেতনই পায় যেই বেতন সমতলের সৈন্যরা পায়।তাহলে আপনারাই বলুন কিসের লোভে ওরা ঐ দুর্গম অঞ্চলে পড়ে থাকে??? আমার লেখার উদ্দেশ্য কোন বাহিনীকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া নয় কারন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দিকে যারা কাঁদা ছুড়ে দিচ্ছেন তারা হয়ত নিজেরাই বুঝে না কাঁদাটা ঘুরে তাদের গায়েই এসে লাগছে কারন দেশটা আমাদের সবার। আমার দেশের অহংকার আমার দেশের সম্মানকে কাঁদা লেপন করার মহৎ উদ্দেশ্য গ্রহনকারীরা কতখানি দেশপ্রেমিক এটাও দেখার বিষয়। পার্বত্য অঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে পাহাড়ের সরল মানুষগুলির আচরন শুধু কাছেই টানেনা ওদেরকে নিয়ে ভাবায়। তবে বিষয়টা হচ্ছে সেই ভাবনাটাকে কে কোন ভাবে ব্যবহার করছে। আমরা কেন ওদের শিক্ষা নিয়ে লড়াই করিনা। আমি শুধু যদি এক আলিকদমের শিক্ষার সমিকরন দাড় করাই তাতেই বোঝা যাবে ঐ অঞ্চলের শিক্ষার হার সমতল থেকে কতখানি নিচেয় আছে। পার্বত্য আলীকদম উপজেলায় স্বাধীনতা পূর্ববর্তী কাল থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সূচনা হয়। ১৯৬০ সালে ‘আলীকদম প্রাথমিক বিদ্যালয়’ বর্তমান আলীকদম আদর্শ সরকারিপ্রাথমিক বিদ্যালয়’টির গোড়াপত্তন ঘটেছিল। এ উপজেলা শিক্ষাক্ষেত্রে খুবই অনগ্রসর জনপদ। আধুনিকবিশ্বে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষর এ যুগে শিক্ষিত সমাজ সৃষ্টি না হলে দারিদ্র বিমোচন থেকেশুরু করে কোন পরিকল্পনা প্রণয়ন, উন্নয়ন বাস্তবায়ন, সংস্কৃতি ও শিল্প-সাহিত্য চর্চাকে এগিয়ে নেওয়াঅসম্ভব। অথচ এখানে একটি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়, একটি বেসরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও একটিদাখিল মাদরাসা রয়েছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে। বাস্তবতার নিরিখে বলতে হয়, এসবশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমুহের লেখাপড়ার মান ও পরিবেশ কাঙ্খিতমানের নয়। দু:খজনক হলেও সত্য যে,এতদাঞ্চলের ছাত্র-ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজ না থাকায় দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীরা অধিকন্তু উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তবে আশার কথা যে, আলীকদম জোনের সাবেক অধিনায়ক লেঃ কর্ণেলআবুল কালাম আজাদ, পিএসসি, এলএসসি’র উৎসাহ-উদ্দীপনায় স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের দাবীর প্রেক্ষিতে‘আলীকদম মৈত্রী জুনিয়র হাইস্কুল (প্রস্তাবিত স্কুল এন্ড কলেজ)’ নামে আরো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরগোড়াপত্তন হয়েছে। আর সেখানেই যোগ হয়েছে মুরং কমপ্লেক্স। নিদৃষ্ট একটি পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীকে টেনে তুলে আনার একটা মহতী উদ্যোগ। যে জাতির শিক্ষার অবস্থা এমন তাদেরকে আপনারা শিক্ষার আলোর জন্য লড়াই করতে না শিখিয়ে কোন অধিকার আদায় করতে শেখাচ্ছেন??? আপনাদের অধিকার আদায়ের লড়াইকি পাহাড়ের সাধারন জনগোষ্ঠীর জন্য না নিদৃষ্ট গুটি সংখ্যক অস্ত্রধারীদের উস্কে দেবার জন্য??? আন্দোলনের ইস্যুগুলি একবার নিজেরাই খতিয়ে দেখুন। ৩০ লক্ষ প্রানের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা, এই বাংলাদেশ। একটি সোনার বাংলার গড়ার আশায় হায়েনাদের মুখ থেকে যে দেশকে আমরা ছিনিয়ে এনেছিলাম সেই স্বাধীন বাংলার সোনার রাজ্যের মানুষগুলিই অন্ধকারে পড়ে আছে। তাই বলছি নিদৃষ্ট একটি বাহিনীকে নিজেদের প্রতিহিংসার আগুনে পোড়ানোর চেষ্টা না করে আসুন সবাই মিলে ওদের শিক্ষার আলোতে আনার চেষ্টা করি। মুরং কমপ্লেক্সের মত আরো কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি, হোক সেটা সেনাবাহিনীর হোক ব্যাক্তিমালিকানার,হোক সরকারী, হোক আধা সরকারী। ঐ এলাকায় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য লড়াই করুন দেখুন এই মহতি কাজে অন্তরায় কারা হয়ে দাঁড়ায়।

পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিটা উপজেলা প্রতিটা থানায় স্কুল হোক,আর কমপ্লেক্সই হোক ওদেরকে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাবস্থা করিয়ে দেবার জন্য সরকারের সূদৃষ্টি কামনা করছি। আর সুশিলদেরকে আবারো বলছি ওদেরকে আলোতে আসতে উৎসাহ দিন ওরা শিক্ষিত জাতি হয়ে উঠুক এরপর ওরাই সিদ্ধান্ত নিবে ওরা কি হতে চায় বাংলাদেশের সুনাগরিক না অন্য কিছু। আপনারা কতজন সাধারন পাহাড়িদের মতামত নিয়েছেন আমি জানিনা তবে এটা নিশ্চিত শতকারা ৯০ ভাগ সাধারন মানুষ চায় সুনাগরিক হতে।  যারা ঘরে বসে সমালোচনায় বিভোর তাদেরকে আহ্বান করব একবার আলিকদম যান। দেখে আসুন মুরং কমপ্লেক্স। আমি যখন ওদের কাছে যাই ওদেরকে এক সারিতে দাড় করিয়ে গাওয়াই আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি,সে সুখের অনুভুতি বোঝাতে পারব না। শুধুই মনে হচ্ছিল এই সোনার বাংলাই তো আমার বাবা সহ আমার দেশের লাখো শহিদের রক্ত  চেয়েছিল।আপনারা যারা আজ ঐ অঞ্চলের সরল মানুষ গুলিকে আলাদা করে দেখার কথা ভাবছেন তাদেরকে মনে করিয়ে দেই বঙ্গবন্ধু যেই সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর জন্য স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠী কিন্তু তাদের বাইরে ছিলনা। ঐ অঞ্চলেও মুক্তি যুদ্ধ হয়েছে, ঐ জায়গাকেও এই দেশের মানুষ প্রানের বিনিময়ে স্বাধীন করেছে। যার জলন্ত প্রমান বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ। যার সমাধি ঐ অঞ্চলেই আছে। সুতারাং আমার দেশের একটা অংশকে নিয়ে কারোরই কোন অপরাজনীতি করার অধিকার নেই। ঐ অঞ্চলের প্রতিটা মানুষকে সেই অধিকারের জন্য লড়াই করতে শেখান উচিৎ যে অধিকার এদেশের সমতলের বাকি জনগোষ্ঠী গুলো পাচ্ছে।

পড়ে দেখুন

“চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ রক্ষা” পরিষদের নিয়মিত মাসিক সভা অনুষ্ঠিত

“চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ রক্ষা” পরিষদের নিয়মিত মাসিক সভায় সম্মানিত সভাপতি আলহাজ¦ আবুল কালাম আজাদ এর …