শিরোনাম
প্রচ্ছদ / ব্রেকিং নিউজ / পার্বত্য চুক্তির দু’দশক পূর্তিতে জনসংহতি সমিতির বিক্ষোভ সমাবেশ

পার্বত্য চুক্তির দু’দশক পূর্তিতে জনসংহতি সমিতির বিক্ষোভ সমাবেশ

॥ নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির স্বাক্ষরকারী দুইপক্ষ সরকার ও জনসংহতি সমিতির আলাদা কর্মসূচী পালনের মধ্যে দিয়ে রাঙ্গামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির ২০ বছরপূর্তি পালন করা হয়েছে। চুক্তির দু’দশক পূর্তিতে সরকার পক্ষে বের করা হয় আনন্দ শোভাযাত্রা কেক কাটা ও আলোচনা সভা আর জনসংহতি সমিতির পক্ষে বিক্ষোভ সমাবেশ করে এই কর্মসূচী পালন করা হয়। ২ ডিসেম্বর শনিবার পার্বত্য চুক্তির পূনাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবী নিয়ে চুক্তির ২০তম বর্ষপূর্তিতে স্থানীয় জিমনেসিয়াম প্রাঙ্গণে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।
সমাবেশ জনসংহতি সমিতির জনসভায় সংসদ সদস্য ও জনসংহতি সমিতির সহ সভাপতি উষাতন তালুকদার বলেন, পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা রয়েছে। কিন্তু তা সত্বেও সরকারের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা একটি গোষ্ঠীর বাধার কারণে চুক্তি বাস্তবায়ন এগুতে পারছে না। তিনি সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে দ্রুত রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। বিলম্ব করা চলবে না। যত দ্রুত সম্ভব এর কার্যকর করতে হবে।
উষাতন তালুকদার আরো বলেন, দীর্ঘ দুই যুগ প্রতীক্ষার পরেও চুক্তি আশানারূপ বাস্তবায়িত না হওয়ায় পাহাড়ের লোকজনেরর মধ্যে ক্ষোভের সৃস্টি হচ্ছে। জনসংহতি সমিতির নেতা সন্তু লারমার দিক নিদের্শনার মতো সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়ে উষাতন তালুকদার বলেন, দ্রুত পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করা না হলে আন্দোলন সংগ্রাম জোরদার করা হবে।
রাঙ্গামাটি জনসংহতি সমিতির সভাপতি সুবর্ণ চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. হোসাইন কবীর, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অশোক সাহা, জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতির রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অরুণ ত্রিপুরা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুমন মারমা প্রমুখ।
জনসংহতি সমিতির রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নীলোৎপল খীসার সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন জনসংহতি সমিতির সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুপ্রভা চাকমা।
ঊষাতন তালুকদার বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা একটি রাজনৈতিক সমস্যা। চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলতে গিয়ে সরকার প্রায়ই পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন কার্যক্রমের ফিরিস্তি তুলে ধরে আসছে। কিন্তু এই সমস্যা অর্থনৈতিক সমস্যা নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় আজ পার্বত্যবাসীর শাসনতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রয়েছে। প্রশাসনিক ও আইন-শৃঙ্খলার ক্ষমতা ও কার্যাবলী এখনো আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে দেয়া হয়নি। পার্বত্য জেলার ডেপুটি কমিশনার ও পুলিশ সুপাররা সমতল অঞ্চলের মতো পার্বত্য জেলায় শাসনকার্য পরিচালনা করছে। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক পার্বত্যাঞ্চলের শাসনব্যবস্থা দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে পৃথক। সরকার আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে অথর্ব করে রেখে উপনিবেশিক কায়দায় পার্বত্যাঞ্চলের শাসনকার্য পরিচালনা করছে।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চুক্তির ২০তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে পার্বত্যবাসীর সাথে ভিডিও কনফারেন্সের জন্য এবং পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্যাঞ্চলে যে হতাশা, সন্দেহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে, তা অনুভব করার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তবে কেবল অনুভব করলে হবে না, তার জন্য অবাস্তবায়িত বিষয়সমূহ বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ দিতে হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, পার্বত্যাঞ্চলে নিয়োজিত অনেক কর্মকর্তা পার্বত্য চুক্তি ও পাহাড়িদের বিষয়ে সংবেদনশীল নয়। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে পোস্টিং দেয়ার আগে তাদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ আইন, শাসনব্যবস্থা, পাহাড়ির সংস্কৃতি বিষয়ে ধারণা দেয়া দরকার বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
ঊষাতন তালুকদার আরো বলেন, জুম্ম জনগণের সংগ্রাম বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে নয়। এই সংগ্রাম জুম্ম জাতীয় অস্তিত্ব সংরক্ষণ, ভূমি ও সংস্কৃতির অধিকারের জন্য। জুম্মদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তাদের আর পিছনে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব সংরক্ষণ তথা চুক্তি বাস্তবায়নের সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, পার্বত্য সমস্যার সমাধানে এখনো সময় আছে। তাই দ্রুততার সাথে সরকারকে চুক্তি বাস্তবায়নসহ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় যে কোন অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির জন্য সরকারই দায়ী থাকবে বলে তিনি হুশিয়ারি উচ্চারন করেন।
পরে জনসংহতি সমিতির একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। রাঙ্গামাটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাহাড়ী লোকজন প্লেকার্ড ও ফেষ্টুন নিয়ে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলে অংশ গ্রহন করেন।
জুরাছড়ি প্রতিনিধি সুমন্ত চাকমা জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সাধারণ সম্পাদক প্রণতি বিকাশ চাকমা বলেছেন, জুম্ম জাতি আজ নিঃশেষ হতে বসেছে। সরকার চুক্তি বাস্তবায়নও করবে না ? আন্দোলন করতে দেবেনা ? জুম্ম জাতির সুখ দুখের কথা দেশে বিদেশে প্রচার করতে দেবেনা ? তাহলে জুম্ম জনগন কি করবে ! কি করতে হবে এর উত্তর জুম্ম জনগণকে বেচে নিতে হবে। এটিই এখন সময়ের দাবী।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে বৃহত্তর গণ আন্দোলন সংগঠিত করুন-পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী ও জুম্মস্বার্থ পরিপস্থি সকল কার্যক্রম প্রতিরোধের ডাকে জুরাছড়ি উপজেলা জেএসএসের উদ্যোগে পার্বত্য শান্তি চুক্তির ২০ বছর পূতি উপলক্ষে গণ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রণতি বিকাশ চাকমা একথা বলেন।
জেএসএসের সাধারণ সম্পাদক প্রণতি বিকাশ চাকমা আরো বলেন, দশ দফা কর্মসূচীর ভিত্তিতে যে রূপ রেখা আছে সে আন্দোলন জোরদার করা হবে। সরকার এ আন্দোলনে বাঁধা দিলে এর থেকে কঠোরতম আন্দোলন ও পরিপূর্ণ ভাবে অসহযোগ আন্দোলনে জনগণ যেতে বাধ্য হবে।
তিনি আরো বলেন, জনসংহতি সমিতি এখনো বিশ্বাস করে পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তাবয়ন করলে বাংলাদেশের একমাত্র জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকার করবে। এটি এখনো আমরা বিশ্বাস করতে চাই কিন্ত যত দিন যাচ্ছে এই চিত্তা, চেতনার বাধঁ ভেঙ্গে যাচ্ছে।
প্রণতি বিকাশ চাকমা আরো বলেন, জুরাছড়ি উপজেলা থেকে একজন উপজেলা চেয়ারম্যানসহ সাধারণ জনগণ রাঙামাটির উদ্দিশ্যে যেতে হলে সেনা বাহিনীর বেষ্টি ভিজাকিচিং ক্যাম্পে লঞ্চ থামিয়ে জবাববিহী করতে হচ্ছে- এই কি পার্বত্য চুক্তির নমুনা।
প্রণতি বিকাশ চাকমা আরো বলেন, জনসংহতি সমিতি কোন বাঙালির বিরুদ্ধে নয়, কিন্ত শাসক গোষ্ঠীর বাঙালি করণের যে বিষয় তার বিরোধীতা করে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বসবাসরত মানুষের মাঝে সত্যিকার শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষে পূনাঙ্গ শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই বলে জোর দাবী জানান।
এদিকে গণ সমাবেশের সভাপতি মায়া চাকমা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রী কমিটির নির্বাহী সদস্য ও সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারকে উদ্দিশ্য করে বলেন, জুম্ম জনগণের অধিকারের কথা ঢাকায় গিয়ে তুলে ধরেন, খেতে খাওয়া মানুষের অধিকার আদায়ে কাজ করেন আপনাকে জনগনের কাছে ভোট চাইতে হবে না। আপনাকে জনগণ আমরণ মন্ত্রীর চেয়ারে বসাবে।
তিনি সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারের এক বক্তব্যে সমালোচনা করে বলেন, যখন জনসংহতি সমিতির মনোনিত এমপি ঊষাতন তালুকদার কাপ্তাই হ্রদের পানি যথা সময়ে কমিয়ে দিতে পারছেন না তখন আপনি কি করেছেন। ক্লাবে কিংবা মদের আড্ডায় মাটাল ছিলেন।
উপজেলা শিশুপার্কে অনুষ্ঠিত গণসমাবেশে উপজেলা জনসংহতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুমিত চাকমার ধারা সঞ্চলনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন, ভাইস চেয়ারম্যান রিটন চাকমা, এছাড়া, উপজেলা চেয়ারম্যান উদয় জয় চাকমা, হেডম্যান রিপন পাংখোয়া, জুরাছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান ক্যানন চাকমা, রাঙ্গামাটি জেলার যুব সমিতির সভাপতি টয়েন চাকমা, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রিয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক সুমিত্র চাকমা প্রমূখ। এছাড়া সমাবেশে বনযোগীছড়া, মৈদং ও দুমদুম্যা ইউপি চেয়ারম্যানগণ, স্থানীয় বিভিন্ন মৌজার হেডম্যান-কর্ব্বারীগণ উপস্থিত ছিলেন।

পড়ে দেখুন

অধিক শস্য ফলনের জন্য বিদ্যুৎ ব্যবহারে সবাইকে সাশ্রয়ী হবার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

॥ ডেস্ক রিপোর্ট ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হবার পাশাপাশি সকলকে সঞ্চয় করার …