শিরোনাম
প্রচ্ছদ / গণমাধ্যম / রাঙ্গামাটিতে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের স্মরণ সভায় বক্তারা

রাঙ্গামাটিতে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের স্মরণ সভায় বক্তারা

॥ নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ পাহাড়ের মানুষ ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ ভাইকে কখনোই ভুলতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। বক্তারা বলেন, পাহাড়ে ম্যালেরিয়া ও যক্ষ্মা নির্মুলে আবেদ ভাইয়ের ব্র্যাক যে ভূমিকা রেখেছে চলেছে তা প্রশংসার দাবী দার। পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম এলাকায় ম্যালেরিয়া একটি সময় শত শত লোক মারা যেতো। কিন্তু সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি ব্র্যাকের কর্মীরা দুর্গম এলাকায় গিয়ে সেবা প্রদানের মাধ্যমে ম্যালেরিয়াকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। বক্তারা বলেন, বর্তমানে ম্যালেরিয়া রোগী ধরা পড়লেও মৃত্যুও হার শূণ্যেও কোটায় চলে এসেছে।
গতকাল ২৯ জানুয়ারী বুধবার রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ ভাইয়ের স্মরণ সভায় বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন।
স্মরণ সভায় বক্তব্য রাখেন রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোঃ নুরুল হুদা, রাঙ্গামাটি সিভিল সার্জন ডাঃ শহীদ তালুকদার, জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর রাঙ্গামাটির উপ পরিচালক হোসনে আরা, রোভার স্কাউট কমিশনার নুরুল আবসার, ব্রাক কর্মকর্তা মোঃ জসিম উদ্দিন, ব্রাক কর্মী পুস্পিতা চাকমা।
স্বাগত বক্তব্য ব্র্যাক রাঙ্গামাটি জেলা সমন্বয়কারী মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন, স্যার ফজলে হাসান আবেদ একজন পরিপূর্ণ মানুষের প্রতিকৃতি। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ব্র্যাক’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ার এমেরিটাস। ১৯৩৬ সালের ২৭শে এপ্রিল তদানীন্তন সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার বানিয়াচংয়ে তাঁর জন্ম। সৈয়দা সুফিয়া খাতুন এবং সিদ্দিক হাসানের দ্বিতীয় সন্তান তিনি।
১৯৫২ সালে পাবনা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে তিনি আইএসসি পাস করেন।
পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিদ্যায় অনার্সে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে না পড়ে তিনি ইংল্যান্ডে চলে যান। তখন ফজলে হাসান আবেদের ছোট চাচা সায়ীদুল হাসান ছিলেন লন্ডনে পাকিস্তান দূতাবাসের বাণিজ্য সচিব।
তিনি আবেদকে স্কটল্যান্ডে গিয়ে গ্লাসগো ইউনিভার্সিটিতে নেভাল আর্কিটেকচারে ভর্তি হতে বলেন। ১৯৫৪ সালে আবেদ স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ইউনিভার্সিটিতে নেভাল আর্কিটেকচারে ভর্তি হন। কিন্তু দুই বছর লেখাপড়া করার পরে তিনি নেভাল আর্কিটেকচার পড়া বাদ দিয়ে অ্যাকাউন্টিংয়ে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
লন্ডনে গিয়ে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিংয়ে লেখাপড়া করেন। ১৯৬২ সালে ‘কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টিং’-এর ওপর তিনি প্রফেশনাল কোর্স সম্পন্ন করেন ।
১৯৭০ সালে আবেদ শেল অয়েল কোম্পানির চট্টগ্রাম অফিসে যোগ দেন এবং এরপর পদোন্নতি লাভ করে ফাইন্যান্স বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান। শেল অয়েল কোম্পানিতে কর্মরত থাকাকালে ১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। সন্দ্বীপ, হাতিয়া, মনপুরা এই তিনটি দ্বীপের লাখ লাখ মানুষ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে মৃত্যুবরণ করেছিল।
ফজলে হাসান আবেদ, তাঁর বন্ধু ব্যারিস্টার ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী, সহকর্মী কায়সার জামান, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আকবর কবীর এবং নটর ডেম কলেজের শিক্ষক ফাদার টিম মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন ত্রাণ বিতরণ করতে তাঁরা মনপুরাতে যাবেন।
এসময় তিনি তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে মিলে ‘হেলপ’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তুলে ঘূর্ণি উপদ্রুত ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত মনপুরা দ্বীপের বিপন্ন ও বিধ্বস্ত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
সেখানে তাঁরা ব্যাপক ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। সর্বস্ব এবং স্বজন হারানো মানুষের কাছে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি তাঁরা তৈরি করে দিয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সহায়তায় ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’ ও ‘হেলপ বাংলাদেশ’ গঠন
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্যার ফজলে হাসান আবেদ শেল অয়েল কোম্পানির উচ্চপদের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ইসলামাবাদ ও কাবুল হয়ে লন্ডনে চলে যান।
১৯৭১ সালের মে মাসে লন্ডনে গিয়ে সমমনা বন্ধুদের সঙ্গে মিলে সম্পৃক্ত হলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের লড়াইয়ে। মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্য গড়ে তুললেন ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’ ও ‘হেলপ বাংলাদেশ’ নামে দুটো সংগঠন।
‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’-এর কাজ ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক সমর্থন আদায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে জনমত তৈরি এবং পাকিস্তানি বাহিনির বর্বরোচিত কার্যকলাপ বন্ধের জন্য ইউরোপীয় দেশসমূহের সরকারকে সক্রিয় করে তোলা।
‘হেলপ বাংলাদেশ’-এর কাজ ছিল অর্থসংগ্রহ করে মুক্তিবাহিনীকে সহযোগিতা করা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি, প্রচারণাপত্র বিলি করা, টাইমস অব লন্ডনে লেখা ও বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা, রেডিও ও টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেওয়া, ইউরোপীয় দেশসমূহের পার্লামেন্ট সদস্যদের আলোচনার মাধ্যমে স্বদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিবিধ কর্মতৎপরতা পরিচালনা করা।
এ ছাড়া পথনাটক, তহবিল সংগ্রহসহ নানা ধরনের কাজে তিনি ও তাঁর বন্ধুরা সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছিলেন।
‘ব্র্যাক’ প্রতিষ্ঠা
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল বাংলাদেশ।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে ফজলে হাসান আবেদ সদ্যস্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ফেরার সময় তিনি তাঁর লন্ডনের ফ্ল্যাটটি ১৬ হাজার পাউন্ড দামে বিক্রি করে দিয়েছিলেন।
১ কোটি শরণার্থী, যারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, তারা তখন দেশে ফিরে আসতে শুরু করেছে। আবেদ ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনকল্পে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। মুক্তিযুদ্ধকালে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া সিলেটের সুনামগঞ্জের শালশা ও দিরাই অঞ্চলকে তিনি তাঁর কর্ম-এলাকা হিসেবে বেছে নেন।
১৯৭২ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রার ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন।
এই দিন থেকেই বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাসিসটেন্স কমিটি সংক্ষেপে ‘ব্র্যাক’-এর শালষা প্রকল্পের প্রথম পর্বের সূচনা হয়। এটিই ‘ব্র্যাক’-এর আনুষ্ঠানিক জন্মদিন।
দায়িত্বপালন ও অবসর গ্রহণ স্যার ফজলে হাসান আবেদ ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭২ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ব্র্যাকের চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন।
স্যার ফজলে হাসান আবেদ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ২০০১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ-এর চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন।
তিনি ব্র্যাক ব্যাংকেরও প্রতিষ্ঠাতা। ২০০১ সাল থেকে ২০০৮ সাল এবং ২০১৩ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্যার ফজলে হাসান আবেদ ২০১৯ সালের ১লা আগস্ট তারিখে ব্র্যাক-এর চেয়ারপারসন পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
তখন তিনি ব্র্যাক-এর চেয়ার এমেরিটাস পদে আসীন হন। স্যার ফজলে হাসান আবেদ ২৪শে জুলাই ২০১৯ তারিখে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ড-এর চেয়ারপারসন পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ২৬শে আগস্ট তারিখে ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারপারসন পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
অশোকা স্যার ফজলে হাসান আবেদকে ‘গ্লোবাল গ্রেট’ স্বীকৃতিতে ভূষিত করেছে। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের ‘ গ্লোবাল অ্যাকাডেমিক ফর সোশ্যাল অন্ট্রাপ্রেনিওরশিপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, ব্রাকের সুধীজন ও কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
স্যার ফজলে হাসান আবেদের স্মরণে শপথ পাঠ করান সংস্থার ব্র্যাক রাঙ্গামাটির সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডাঃ কেতি চাকমা।

পড়ে দেখুন

“চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ রক্ষা” পরিষদের নিয়মিত মাসিক সভা অনুষ্ঠিত

“চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ রক্ষা” পরিষদের নিয়মিত মাসিক সভায় সম্মানিত সভাপতি আলহাজ¦ আবুল কালাম আজাদ এর …